Monday, January 11, 2016

                                                       ভুল ত্রুটি মার্জনীয়
এই বাস দাড়াও......এই..... বাস থামলো।
অবশেষে দৌড়িয়ে হাফাতে হাফাতে বাসে উঠলাম।১৩ নম্বর সীটে আমার জায়গা। ১৩ আনলাকী সংখ্যা।ভাগ্যে কি আছে,কে জানে!
ও,হ্যা! আমার নাম নিহান।অনার্স ৩য় বর্ষের ছাত্র।
আমার গন্তব্য রাজশাহীর পুঠিয়া।সেখানে এক আন্টির বাসায় যাচ্ছি।এক সময় আমরা সেখানে ভাড়ায় থাকতাম।কোন এক বিশেষ কারনে আজ প্রায় ১১ বছর পর,আন্টি আমাকে জরুরি তলব করেছেন।
.
ওখানে আমার শৈশবের ১টা উল্লেখ যোগ্য ঘটনা রয়েছে। ওয় আন্টির মেয়ে সুরভী কে নিয়ে।শুনবেন ঘটনা টা?
আচ্ছা,শুনুন,
আমি আর সুরভী সমবয়সী ছিলাম।এছাড়াও ওর আম্মু আর আমার আম্মুর ভিতর খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। তাই,আমরা ছোট থেকে এক সাথেই বড় হয়েছি।এক সাথে খেলা করতাম।স্কুলে যেতাম।বেশির ভাগ সময় ই আমরা এক সাথে কাটাতাম।
তখন আমি পুঠিয়া পি,এন স্কুলে ক্লাস ফাইভে।সুরভি ও আমার ব্যাচ ছিল।একদিন স্কুলে যাবার সময় সুরভীকে কেমন চিন্তিত দেখালো।আমি জিজ্ঞেস করলাম।ও কিছু বলল না।স্কুলে পৌছাবার পর হঠাৎ সে আমাকে এক টুকরো কাগজ দিয়ে দৌড়ে চলে গেল।কাগজ টা খুলে কিছুক্ষন আমি 'থ' মেরে রয়লাম।সেখানে লিখা ছিল,"নিহান আমি তোমাকে ভালবাসি।শুধু তোমাকেই চায়"
.
সে সময় এসব প্রেম ত্রেম কিছুই বুঝতাম না। তাই,বিকেলে সুরভীকে ডেকে খুব বকলাম।"দেখ,এসব ভালনা। তুমি এটা ঠিক করনি।আর কখনো আমার সাথে কথা বলবেনা।আর যদি এমন কাজ করো তাহলে আম্মুকে বলে দিব।"
সুরভী কাঁদতে কাঁদতে চলে যায় তখন।এরপর দীর্ঘ দিন ওর সাথে কোন কথা বলিনা।ও আমাকে দূর থেকে দেখে।চোখ পড়লেই পালিয়ে যায়।এভাবে চলতে চলতে বৃত্তি পরিক্ষার সময় চলে আসল।বৃত্তির জন্য আমাদের স্পেশাল কোচিং করানো হচ্ছে।
একদিন আমি একা ক্লাসে বসে ছিলাম।হঠাৎ সুরভী রুমে ঢুকল।আর তখনই ক্লাসের সব থেকে দুষ্টু ছেলে সৈকত রুমের দরজাটা বন্ধ করে দেয়।আমি তো ভয়ে এইটুকু হয়ে গেছি।প্রায় কেঁদে ফেলেছি।অনেক আকুতি মিনুতি করার পর বেয়াদব টা দরজা খুলে দেয়।
কিন্তু,দরজার ওপাশে অন্যান্ন বন্ধুরাও দাড়িয়ে আছে।ওরা সবাই মিলে আমাকে ক্ষেপাতে লাগল।সুরভী মুচকি মুচকি হাসছে।আমিতো কাঁদতে শুরু করে দিলাম! অনেকদিন এ জালানো সহ্য করা লেগেছে!
বৃত্তি পরীক্ষার পর বাবার প্রমোশন হয়ে খুলনায় পোস্টিং হয়। তাই আমরা খুলনায় চলে আসি।আসার সময় চোখে টলমলে জল নিয়ে কান্না জড়িত কন্ঠে বলে, সাবধানে যেও।ভাল থেকো। তখন মনে হয়েছিল এই মুখটিই পৃথিবীর সব চেয়ে মায়াবী মুখ।
.
সেখান থেকে চলে আসার পর বেশ কিছুদিন ওর কথা খুব মনে পড়ে।এরপর সময়ের পরিবর্তনে আর নিজের ব্যাস্ততায় আস্তে আস্তে ভুলে যায় ওর কথা।আজ আবার সুরভীর কথা খুব মনে পড়ছে।ওর সাথে কাটানো সময় গুল।ওর সেই শেষ চাহনী চোখের সামনে ভেষে উঠছে।
ভাবতে ভাবতেই বাস স্টপে পৌছে গেলাম। তারপর একটি চি,এন,জি নিয়ে পুঠিয়ায় সুরভীর বাড়িতে গেলাম।যাবার সময় লক্ষ করলাম,সব কিছুই যেনো কেমন পাল্টে গেছে।
চেনা জায়গা গেলো আজ কেমন অচেনা লাগছে।শুধু দূর থেকে একটি বাড়িকে খুব চেনা চেনা লাগছে।আমায় হাত ছানি দিয়ে ডাকছে।আসছি আমি আসছি.....!
বাসার সামনে নামতেই কেমন একটি থমথমে পরিবেশ অনুভব করলাম।কিছু একটা গড়মিল লাগল। কেমন হৈ চৈ শোনা যাচ্ছে।আজ কি সুরভীর বিয়ে? হতেও পারে! ভিতরে ঢুকতেই দেখলাম অনেক ভিড়।
কান্নার শব্দ শুনতে পাচ্ছি।আমাকে দেখে ১টি ছেলে দৌড়ে আসল।বলল,আপনি......আপনি কি নিহান ভাইয়া? (ফুপিয়ে ফুপিয়ে বলল)
~হ্যা। তুমি সাগর না? সুরভীর ভাই?
(কাঁদতে কাঁদতে বলল) হ্যা।আপনি আরেকটু আগে আসতে পারলেন না? আপু শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আপনার জন্য অপেক্ষা করেছে।
~মানে?
~আপু......আপু ৩ ঘন্টা আগে মারা গেছে!
কথাটা শুনেই মনে হলো কেউ আমার বুকের ভিতর কয়েক হাজার তির ছুড়ল।কিছুক্ষনের জন্য অন্য কথাও হারিয়ে গেছিলাম! কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না।
সাগর বলল,কয়েক মাস আগে আপুর ফুসফুসে ক্যানসার ধরা পড়ে।এরপর আস্তে আস্তে অবস্থার অবনতি হতে থাকে।আপু আপনার কথা খুব বলত।
.
অনেক কশতে আপনাদের ফোন নাম্বার যোগাড় করে মা আপনাকে খবর পাঠায়।আপুর শেষ ইচ্ছে পুরনের জন্য।কিন্তু,আপুর শেষ ইচ্ছে টাও পূরন হলো না! অনেক দেরী করে ফেললেন আপনি।
গত কাল থেকে অবস্থা খুবই খারাপ হয়ে যায়। তারপর রাজশাহী মেডিকেলে নিয়ে যাওয়া হয়।শেষ পর্যন্ত আর শেষ রক্ষা হলো না.......!
আসুন।আপুকে দেখবেন....
~না,সাগর।সময় থাকতে তোমার আপুর সামনে যেতে পারিনি আমি।যখন আমাকে ওর প্রয়োজন ছিল তখন আসিনি। আমি ওর লাসের সামনে কিভাবে যাবো?
তোমার আপু আমার কাছে সেই ছোট্র সুরভীই আছে!
আজ ওর লাসের দিকে তাকিয়ে,তার সেই ছলছলে চোখের মায়াবী চাহনিকে খুঁজে নিতে পারব না আমি।
থাকতে পারলাম না আর। চলে আসলাম ওখান থেকে। খুব দ্রুত গতিতে হাটছি আমি।কোন দিকে খেয়াল নেই। উদ্দেশ্য বিহীন ভাবে হাটছি।চোখে ভাষছে সেই শেষ চাহনিটা। চোখে টলমলে জল নিয়ে কেউ আমায় বলছে,
ভাল থেকো! প্রতি ধ্বনিত হয়ে সেই শব্দ বারবার আমার কানে বাজছে! তুমি ভাল থেকো......ভালো থেকো.......!
[বিঃদ্রঃ ভুল ত্রুটি মার্জনীয়]

No comments:

Post a Comment