ছোটগল্পঃ শরতী
.
প্রেমজগতের সদস্য হয়ে নিজেকে ভীরু প্রেমিক, পৌরুষহীন প্রেমিক বানিয়ে রাখব, তা কি হয়! কখনোই না। প্রেমের ভারী ভারী গুণীবাক্যগুলো রীতিমতো মনেপ্রাণে লালন করে প্রেমজগতের একজন গর্বিত সদস্য হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় কাজগুলো বেশ আগ্রহ উদ্দীপনার মধ্য দিয়েই শেষ করলাম। বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে একে অপরের প্রতি প্রেমটাকে ষোলকলায় পূর্ণ করার রাস্তাটা পুরোপুরি পরিষ্কার দিলাম।
.
.
প্রেমজগতের সদস্য হয়ে নিজেকে ভীরু প্রেমিক, পৌরুষহীন প্রেমিক বানিয়ে রাখব, তা কি হয়! কখনোই না। প্রেমের ভারী ভারী গুণীবাক্যগুলো রীতিমতো মনেপ্রাণে লালন করে প্রেমজগতের একজন গর্বিত সদস্য হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় কাজগুলো বেশ আগ্রহ উদ্দীপনার মধ্য দিয়েই শেষ করলাম। বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে একে অপরের প্রতি প্রেমটাকে ষোলকলায় পূর্ণ করার রাস্তাটা পুরোপুরি পরিষ্কার দিলাম।
.
মেয়েটির নাম নিশ্চয়ই জানতে ইচ্ছে হচ্ছে? ওর নাম বলার আগে বলা আবশ্যক যে, ওর থেকে আমার বয়সের ব্যবধান ছিল প্রায় ১০ বছরের। আর এই কঠিন বয়সের পাল্লায় ওই ছিল প্রথম। এজন্য যে আমাদের সম্পর্কে কখনো ছত্রাক জন্মাতো তা কিন্তু ভুলেও ভাববেন না। এমনকি ও মাঝে মাঝে আমাকে আদর করে পিচ্চি বলেও ডাকত। শরতের আকাশের মতোই ওর হৃদয়টা ছিলো একদম পরিষ্কার। ওর সাথে শরতের আকাশের মিল খুজে পেতে আমার বেগ পেতে হতো না। ওরকম একটা হৃদয়ের সন্ধান খুজে পেয়ে আমি কতকটা আনন্দিত হয়েছিলাম, তা আপনাদের মাঝে প্রকাশ করারও আমার খুব ইচ্ছে হচ্ছে। দুঃখের বিষয় হচ্ছে, সৃষ্টিকর্তা আমাকে এই সুখানুভূতিটি প্রকাশ করার মতো সাধ্য আজো বোধ করি দান করেন নাই। পাকা দর্পনের ন্যায় পরিষ্কার হৃদয়টাকে আমি অতি আদর করে শরতী বলেই ডাকি। ওর আসল নাম সৈরিতি। এই লেখায় আমার হৃদয়মণিকে শরতী নামেই আপনাদের মাঝে পরিচয় করাতে চাই।
.
.
সবে অনার্স প্রথম বর্ষের পরীক্ষা দিয়েছি ওই সময় শরতীর বয়সের সামাজিক অবস্থা কতটুকু ভয়ঙ্কর তা সহজেই আঁচ করা যায়। পরিবার থেকে ওর ওপর বিয়ের চাপ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাওয়ায় বলা চলে আমাকে একরম নিজ মনের বিরুদ্ধে নিজেকে যুদ্ধ করেই বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিতে হল।
.
পাগলীটা ছোট্টবেলা থেকেই লক্ষ্মী। ছাত্রীবস্থায়ই সে একটা চাকুরি করে বেশ কটা টাকা জমিয়েছিল। ওই জমানো টাকায়ই বিয়ে পরবর্তী ঢাকার জীবন পেরুতে লাগল। কিছুদিনের মধ্যেই বন্ধু মারফত আমিও ছোটখাটো একটা চাকুরি পেয়ে গেলাম। বলতে পারেন, অর্থের ঝক্কিটা আমাদেরকে স্পর্শ করতে পারে নি। এমনি একদিন জানতে পারলাম, পরিবারের ছোট ছেলের এই কঠিন কর্মের সংবাদ পেয়ে মা পরপর দু'বার অজ্ঞান হয়েছেন। শরীরের অবস্থা বলতে তিনি তখনো হাসপাতালেই। বাবা কারো সাথে কথা বলছেন না। একমাত্র বড়ভাই মা-বাবার এই অবস্থায় কি করবেন কিছুই বুঝে উঠতে পারছেন না। সোজাসাপ্টা জানিয়ে দিয়েছেন - কখনো বাড়ি আসিস না, তোকে দেখলে মা মরেই যাবে। এতটুকু বলার পরেই ফোন কেটে দিলেন। ওদিকে আমার সৌদি প্রবাসী শ্বশুরমশাই নাকি বাড়ীতে সাফ বলেই দিয়েছেন- তিনি আর দেশে আসবেন না। তার বংশে এমন লজ্জার ঘটনা কেউ কখনো ঘটানোর সাহস পায় নি। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, এলাকার মানুষকে তার অপমানিত মুখখানা আর দেখাবেন না। এত্তসব কষ্টের ঘটনা শুনে মানসিক অবস্থা কেমন হয় তা তো বুঝতেই পারছেন। শরতী কষ্ট সহ্য করতে পারতো না। কষ্টে একদম নির্বাক হয়ে যেত। ওই মুহূর্তে পাগলীটা আমাকে জড়িয়ে ধরে শুধুই একনাগাড়ে নীরবে চোখের জল ফেলছিল। সে সময়টাতে কি করা উচিত তা ভাবার মতো শক্তি আমাদের ছিলো না।
.
বিবাহ পরবর্তী দিনগুলো আমাদের কিভাবে কেটেছে তা ভাবতে এখনো আমার বুকে চাপা ব্যথা অনুভব হয়। বিষময় ওই দিনগুলোর মাঝেই হঠাৎ একদিন ভাইয়ার ফোন আসল। এখানে বলা আবশ্যক যে, ওনার নাম্বারে কল দিলে কখনো ওপাশ থেকে জবাব আসত না। বেশ খুশিই হয়েছিলাম কল পেয়ে। ওপাশ থেকে কিছু বলার আগেই বললাম- মা কেমন আছে ? সেই সময়গুলোতে মা-বাবার সাথে কথা বলার জন্য মন যে কেমন ক্ষুধার্ত থাকে তা এই অবস্থায় যারা পড়েছে তারাই শুধুমাত্র বুঝতে পারে। ভাইয়া বললেন- মার সাথে কথা বল। মা মিনিট পাঁচেক কথাই বলতে পারলেন না। ওনার এই কষ্টে নিজেকে বিশ্বশ্রেষ্ঠ অপরাধী মনে হচ্ছিল। পরে শুধু এটুকু বললেন- তোমরা বাড়ী আসো। মা যে কতটা অসুস্থ ওনার গলা শুনে আমার বুঝতে দেরি হল না। পরবর্তীতে ভাইয়ার সাথে কথা বলে বুঝতে পারলাম, ওনারা আমাদের কষ্ট করে হলেও মেনে নিতে এখন রাজী আছেন।
.
বিয়ের পর কখনো শরতীর মুখে সেরকম হাসি দেখিনি, সেদিন যেরকম দেখেছিলাম। আনন্দে আটখানা হয়ে এমনভাবে জড়িয়ে ধরে রাখলো, মনে হল হাজার বছর পর যেন এক সুবিশাল তৃপ্ত ভাণ্ডারের সন্ধান পেয়েছি।
.
দেরি না করে তাড়াতাড়ি কাপড়চোপড় গুছিয়ে আত্মামণিকে নিয়ে মাতৃভূমির দিকে রওয়ানা হলাম। পরীক্ষার ফলাফল দেয়ার আগ মুহূর্তে অধিকাংশ ছাত্রের মনের যে অবস্থা হয় আমার অবস্থাটাও ছিলো তখন সেরকম। আগে যখন বাইরে থেকে বাড়ী যেতাম তখনকার মা-বাবার সাথে সেদিনের মা-বাবার হাজারো তফাৎ লক্ষ্য করলাম। সবদিকেই পরিবর্তন। বাইরে থেকে এসে নিজ দায়িত্বে জীবনের প্রথম ঘরে ঢোকার জন্য নিজেকে দরজা খুলতে হল। তারা তাদের ছেলেবৌকে কিভাবে গ্রহণ করল, তা আমি জানি না। যাইহোক, সবকিছু স্বাভাবিকভাবে নেয়ার জন্য শরতী অনেক চেষ্টা করছিল। কোনোভাবেই আমরা স্বাভাবিক হতে পারছিলাম না। এমন অবস্থা হলো বাইরে বেরই হওয়া যাচ্ছিল না। গ্রামের এমন কোন প্রাপ্তবয়স্ক লোক মনে হয় বাদ ছিল না, যে আমাকে আমাদের এই ব্যাপারে মনে আঘাত দিয়ে কথা বলে নি। আমাকে নিয়ে তখন প্রত্যেক বাড়ীতে আলোচনার ধুম চলত। ওতটুকু জীবনে যেসব ব্যাপারে কেউ আমাকে কখনো চিন্তাও করতে পারে নি, সেই মানুষগুলোই সেসব আজে বাজে ব্যাপারে একে অপরকে বলে বেড়াচ্ছিল। জানি না, এতে তারা কেন আনন্দ পেত। আমার বাবা-মা, তাদের পূর্বপুরুষদের নিয়ে এমন সব উদ্ভট আলোচনা গ্রামসুদ্ধ চলছিল যা ভাবতেই বুকটা ঝাঝরা হয়ে যায়। চারিপাশটা আমার কাছে একটা কারাগার, যে কারাগার থেকে মুক্তির কোন পথ খুঁজে পেলাম না। শরতীকে আমার এই কষ্টগুলো কখনোই বুঝতে দিতাম না। ঘরে যতক্ষণ থাকতাম, পাগলী বেশ হাসিমুখেই আমার সাথে মিশত। কিন্তু ওই হাসিতে কেমন যেন একটা মরা মরা ভাব ছিল। আমাদের বাড়িতে আমি বাদে এমন কেউ ছিলো না, যার সাথে মন খুলে ওঁ একটু কথা বলতে পারবে।
.
ভাবীদের মুখে শুনেছি , আমার অনুপস্থিতিতে নাকি মুরুব্বীরা পাগলীকে অনেক খোটা দেয়। প্রায়ই নাকি বলতে শুনেছে- 'আমার ছেলেকে শেষ করেছিস তুই! কুটনী বুড়ী………' এব্যাপারে আমি কখনো ওর কাছে মনের ভূলেও জানতে চাইতাম না। জানি, আমাকে ওঁ কখনোই বলবে না। আমি ওর কষ্টগুলো বুঝতাম। কিন্তু মা-বাবাকে কিছুই বলতে পারতাম না। বলতে গেলেই হাজারো খোঁটা। আমি চাইছিলাম এরকম তর্ক নয়, একটু শান্তি নিয়ে সবাই একসাথে থাকার।
.
শরতীর পরিবার ততদিনেও মেনে নেয় নি। শরতীর এই খারাপ সময়ে যে মেয়েটিকে ওঁ বেশ ভালো সঙ্গী হিসেবে পেয়েছিল, সে হচ্ছে ওর ছোট বোন লাবণ্য কে। লাবণ্য প্রতিনিয়ত আমাদের সাথে কথা বলত। ওর মাধ্যমেই শরতীর মা-বাবার খোঁজ নিতাম। ওঁর ছোট বোনটি একদিন জানাল-ওর জন্য পাত্র খোঁজা হচ্ছে। কিন্তু শরতীর এই ছোট বয়সী ছেলের সাথে পালিয়ে যাওয়ার কথা শুনে মুখের উপরই লোকজন না বলে দিচ্ছে। লাবণ্য সাথে সাথে বলেও দিল, এ কথা যেন ওর আপুকে কখনোই না বলি। ওর আপু সহ্য করতে পারবে না। আমার ধারণা, এই কথাটি ওঁ মুখ ফসকে বলে ফেলেছিল। লাবণ্য জানত না, সবসময় ওঁর সাথে কথা বলার সময় ইয়ারফোনের একটি স্পীকার শরতীর কানে গুজে দেই। কিছু না বলেই ফোনটা কেটে দিলাম। দেখলাম, শরতী অঝরে কাঁদছে। ওকে বোঝানোর মতো শক্তি তখন ছিল না।
.
বেশকিছুদিন পরও আত্মামণির মনমরা ভাব না কাটায় ভাবলাম, ওকে নিয়ে কোথাও বেড়াতে গেলে মন্দ হয় না। ওঁ আবার ভ্রমণ করতে খুব ভালোবাসত। বাবাকে কক্সবাজারের কথা বলা মাত্রই চিৎকার করে বাড়ী মাথায় তুলে ফেললো। মা নরম গলায় বলল- 'তুই তো বউ পাস নাই, কুমির পাইছিস। ৮০ বছরের বুড়ী, তার আবার বেড়ানোর শখ! বুড়ী বয়সেও………!' শরতীর সামনে আমাকে একথাগুলো বলায় চোখের সামনে পৃথিবীকে অস্বাভাবিকভাবে ঘূর্ণায়মান মনে হল। এমন অপমানের পর শরতীকে নিয়ে বাড়ীতে থাকা যায় না তা দ্রুতই আঁচ করতে পারলাম। তাই একরকম বাধ্য হয়েই বের হতে হল। শরতীর দিকেও তাকাতে খুব লজ্জা হচ্ছিল। শরতী আমার ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছিল। ওঁ বলল- চল, ঘুরেই আসি কক্সবাজার থেকে। মন খারাপ করে কি লাভ। যাত্রাপথে ওঁ আমার সাথে অনেক কথা বলছিল যেন আমি স্বাভাবিক হতে পারি। স্বাভাবিক হয়েও গেলাম দুজনই। মোটামুটি একটা ভালোমানের হোটেলে উঠে পড়লাম। মনের এই বিষম অবস্থাতেও খানিক প্রশান্তি সাগরতীরে পাওয়া গেল। ওঁর মুখে একটু হাসির ছাপও দেখলাম। জানিনা, আমাকে দেখানোর জন্যই জোর করে মুখাবয়বে হাসি মাখিয়েছিল কিনা।
.
.
পাগলীটা ছোট্টবেলা থেকেই লক্ষ্মী। ছাত্রীবস্থায়ই সে একটা চাকুরি করে বেশ কটা টাকা জমিয়েছিল। ওই জমানো টাকায়ই বিয়ে পরবর্তী ঢাকার জীবন পেরুতে লাগল। কিছুদিনের মধ্যেই বন্ধু মারফত আমিও ছোটখাটো একটা চাকুরি পেয়ে গেলাম। বলতে পারেন, অর্থের ঝক্কিটা আমাদেরকে স্পর্শ করতে পারে নি। এমনি একদিন জানতে পারলাম, পরিবারের ছোট ছেলের এই কঠিন কর্মের সংবাদ পেয়ে মা পরপর দু'বার অজ্ঞান হয়েছেন। শরীরের অবস্থা বলতে তিনি তখনো হাসপাতালেই। বাবা কারো সাথে কথা বলছেন না। একমাত্র বড়ভাই মা-বাবার এই অবস্থায় কি করবেন কিছুই বুঝে উঠতে পারছেন না। সোজাসাপ্টা জানিয়ে দিয়েছেন - কখনো বাড়ি আসিস না, তোকে দেখলে মা মরেই যাবে। এতটুকু বলার পরেই ফোন কেটে দিলেন। ওদিকে আমার সৌদি প্রবাসী শ্বশুরমশাই নাকি বাড়ীতে সাফ বলেই দিয়েছেন- তিনি আর দেশে আসবেন না। তার বংশে এমন লজ্জার ঘটনা কেউ কখনো ঘটানোর সাহস পায় নি। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, এলাকার মানুষকে তার অপমানিত মুখখানা আর দেখাবেন না। এত্তসব কষ্টের ঘটনা শুনে মানসিক অবস্থা কেমন হয় তা তো বুঝতেই পারছেন। শরতী কষ্ট সহ্য করতে পারতো না। কষ্টে একদম নির্বাক হয়ে যেত। ওই মুহূর্তে পাগলীটা আমাকে জড়িয়ে ধরে শুধুই একনাগাড়ে নীরবে চোখের জল ফেলছিল। সে সময়টাতে কি করা উচিত তা ভাবার মতো শক্তি আমাদের ছিলো না।
.
বিবাহ পরবর্তী দিনগুলো আমাদের কিভাবে কেটেছে তা ভাবতে এখনো আমার বুকে চাপা ব্যথা অনুভব হয়। বিষময় ওই দিনগুলোর মাঝেই হঠাৎ একদিন ভাইয়ার ফোন আসল। এখানে বলা আবশ্যক যে, ওনার নাম্বারে কল দিলে কখনো ওপাশ থেকে জবাব আসত না। বেশ খুশিই হয়েছিলাম কল পেয়ে। ওপাশ থেকে কিছু বলার আগেই বললাম- মা কেমন আছে ? সেই সময়গুলোতে মা-বাবার সাথে কথা বলার জন্য মন যে কেমন ক্ষুধার্ত থাকে তা এই অবস্থায় যারা পড়েছে তারাই শুধুমাত্র বুঝতে পারে। ভাইয়া বললেন- মার সাথে কথা বল। মা মিনিট পাঁচেক কথাই বলতে পারলেন না। ওনার এই কষ্টে নিজেকে বিশ্বশ্রেষ্ঠ অপরাধী মনে হচ্ছিল। পরে শুধু এটুকু বললেন- তোমরা বাড়ী আসো। মা যে কতটা অসুস্থ ওনার গলা শুনে আমার বুঝতে দেরি হল না। পরবর্তীতে ভাইয়ার সাথে কথা বলে বুঝতে পারলাম, ওনারা আমাদের কষ্ট করে হলেও মেনে নিতে এখন রাজী আছেন।
.
বিয়ের পর কখনো শরতীর মুখে সেরকম হাসি দেখিনি, সেদিন যেরকম দেখেছিলাম। আনন্দে আটখানা হয়ে এমনভাবে জড়িয়ে ধরে রাখলো, মনে হল হাজার বছর পর যেন এক সুবিশাল তৃপ্ত ভাণ্ডারের সন্ধান পেয়েছি।
.
দেরি না করে তাড়াতাড়ি কাপড়চোপড় গুছিয়ে আত্মামণিকে নিয়ে মাতৃভূমির দিকে রওয়ানা হলাম। পরীক্ষার ফলাফল দেয়ার আগ মুহূর্তে অধিকাংশ ছাত্রের মনের যে অবস্থা হয় আমার অবস্থাটাও ছিলো তখন সেরকম। আগে যখন বাইরে থেকে বাড়ী যেতাম তখনকার মা-বাবার সাথে সেদিনের মা-বাবার হাজারো তফাৎ লক্ষ্য করলাম। সবদিকেই পরিবর্তন। বাইরে থেকে এসে নিজ দায়িত্বে জীবনের প্রথম ঘরে ঢোকার জন্য নিজেকে দরজা খুলতে হল। তারা তাদের ছেলেবৌকে কিভাবে গ্রহণ করল, তা আমি জানি না। যাইহোক, সবকিছু স্বাভাবিকভাবে নেয়ার জন্য শরতী অনেক চেষ্টা করছিল। কোনোভাবেই আমরা স্বাভাবিক হতে পারছিলাম না। এমন অবস্থা হলো বাইরে বেরই হওয়া যাচ্ছিল না। গ্রামের এমন কোন প্রাপ্তবয়স্ক লোক মনে হয় বাদ ছিল না, যে আমাকে আমাদের এই ব্যাপারে মনে আঘাত দিয়ে কথা বলে নি। আমাকে নিয়ে তখন প্রত্যেক বাড়ীতে আলোচনার ধুম চলত। ওতটুকু জীবনে যেসব ব্যাপারে কেউ আমাকে কখনো চিন্তাও করতে পারে নি, সেই মানুষগুলোই সেসব আজে বাজে ব্যাপারে একে অপরকে বলে বেড়াচ্ছিল। জানি না, এতে তারা কেন আনন্দ পেত। আমার বাবা-মা, তাদের পূর্বপুরুষদের নিয়ে এমন সব উদ্ভট আলোচনা গ্রামসুদ্ধ চলছিল যা ভাবতেই বুকটা ঝাঝরা হয়ে যায়। চারিপাশটা আমার কাছে একটা কারাগার, যে কারাগার থেকে মুক্তির কোন পথ খুঁজে পেলাম না। শরতীকে আমার এই কষ্টগুলো কখনোই বুঝতে দিতাম না। ঘরে যতক্ষণ থাকতাম, পাগলী বেশ হাসিমুখেই আমার সাথে মিশত। কিন্তু ওই হাসিতে কেমন যেন একটা মরা মরা ভাব ছিল। আমাদের বাড়িতে আমি বাদে এমন কেউ ছিলো না, যার সাথে মন খুলে ওঁ একটু কথা বলতে পারবে।
.
ভাবীদের মুখে শুনেছি , আমার অনুপস্থিতিতে নাকি মুরুব্বীরা পাগলীকে অনেক খোটা দেয়। প্রায়ই নাকি বলতে শুনেছে- 'আমার ছেলেকে শেষ করেছিস তুই! কুটনী বুড়ী………' এব্যাপারে আমি কখনো ওর কাছে মনের ভূলেও জানতে চাইতাম না। জানি, আমাকে ওঁ কখনোই বলবে না। আমি ওর কষ্টগুলো বুঝতাম। কিন্তু মা-বাবাকে কিছুই বলতে পারতাম না। বলতে গেলেই হাজারো খোঁটা। আমি চাইছিলাম এরকম তর্ক নয়, একটু শান্তি নিয়ে সবাই একসাথে থাকার।
.
শরতীর পরিবার ততদিনেও মেনে নেয় নি। শরতীর এই খারাপ সময়ে যে মেয়েটিকে ওঁ বেশ ভালো সঙ্গী হিসেবে পেয়েছিল, সে হচ্ছে ওর ছোট বোন লাবণ্য কে। লাবণ্য প্রতিনিয়ত আমাদের সাথে কথা বলত। ওর মাধ্যমেই শরতীর মা-বাবার খোঁজ নিতাম। ওঁর ছোট বোনটি একদিন জানাল-ওর জন্য পাত্র খোঁজা হচ্ছে। কিন্তু শরতীর এই ছোট বয়সী ছেলের সাথে পালিয়ে যাওয়ার কথা শুনে মুখের উপরই লোকজন না বলে দিচ্ছে। লাবণ্য সাথে সাথে বলেও দিল, এ কথা যেন ওর আপুকে কখনোই না বলি। ওর আপু সহ্য করতে পারবে না। আমার ধারণা, এই কথাটি ওঁ মুখ ফসকে বলে ফেলেছিল। লাবণ্য জানত না, সবসময় ওঁর সাথে কথা বলার সময় ইয়ারফোনের একটি স্পীকার শরতীর কানে গুজে দেই। কিছু না বলেই ফোনটা কেটে দিলাম। দেখলাম, শরতী অঝরে কাঁদছে। ওকে বোঝানোর মতো শক্তি তখন ছিল না।
.
বেশকিছুদিন পরও আত্মামণির মনমরা ভাব না কাটায় ভাবলাম, ওকে নিয়ে কোথাও বেড়াতে গেলে মন্দ হয় না। ওঁ আবার ভ্রমণ করতে খুব ভালোবাসত। বাবাকে কক্সবাজারের কথা বলা মাত্রই চিৎকার করে বাড়ী মাথায় তুলে ফেললো। মা নরম গলায় বলল- 'তুই তো বউ পাস নাই, কুমির পাইছিস। ৮০ বছরের বুড়ী, তার আবার বেড়ানোর শখ! বুড়ী বয়সেও………!' শরতীর সামনে আমাকে একথাগুলো বলায় চোখের সামনে পৃথিবীকে অস্বাভাবিকভাবে ঘূর্ণায়মান মনে হল। এমন অপমানের পর শরতীকে নিয়ে বাড়ীতে থাকা যায় না তা দ্রুতই আঁচ করতে পারলাম। তাই একরকম বাধ্য হয়েই বের হতে হল। শরতীর দিকেও তাকাতে খুব লজ্জা হচ্ছিল। শরতী আমার ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছিল। ওঁ বলল- চল, ঘুরেই আসি কক্সবাজার থেকে। মন খারাপ করে কি লাভ। যাত্রাপথে ওঁ আমার সাথে অনেক কথা বলছিল যেন আমি স্বাভাবিক হতে পারি। স্বাভাবিক হয়েও গেলাম দুজনই। মোটামুটি একটা ভালোমানের হোটেলে উঠে পড়লাম। মনের এই বিষম অবস্থাতেও খানিক প্রশান্তি সাগরতীরে পাওয়া গেল। ওঁর মুখে একটু হাসির ছাপও দেখলাম। জানিনা, আমাকে দেখানোর জন্যই জোর করে মুখাবয়বে হাসি মাখিয়েছিল কিনা।
.
সারাদিনের মাত্রাতিরিক্ত অসহ্যতায় আমরা বেশ ক্লান্ত ছিলাম। প্রায় সন্ধ্যারাত্রেই ঘুমেই পড়লাম। অ্যালার্মের শব্দে বুঝতে পারলাম সকাল হয়ে গেছে। বিয়ের পর থেকে প্রত্যেক সকালের অ্যালার্ম ওঁই বন্ধ করত। ওকে বিছানায় না দেখে ভাবলাম, ওঁ হয়তো বাথরুমে গেছে। অ্যালার্ম বন্ধ করার জন্য মোবাইল হাতে নেয়ার সময় দেখলাম, মোবাইলের নিচে একটি ভাজ করা কাগজ। কাগজটির মাঝে মাঝে ফোটা ফোটা পানিতে ভেজার চিহ্ন। ভাজ খোলার পর হাতের লেখাটা চিনতে দেরি হল না। ৩ পৃষ্ঠাব্যাপী শরতীর হাতে লেখা-'লাবণ্যকে ভালো যায়গায় বিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব তোমার উপর রইল। আমাকে নিয়ে তোমার এখানে আসার খুব শখ। তোমার শখের মূল্য দিতে আমার যেতে দেরি হলো। আমাকে খুঁজতে যেও না, আমি সমুদ্রের বিশালতায় হারিয়ে যাচ্ছি…………।'
.
লেখাগুলো পড়তে চোখ ধরে আসছিলো। অনেকদিন পর আমার শরতীর চিঠিখানি আবার পড়ছি। চিঠিখানির ওপর সেদিনের মত আজও ফোটা ফোটা পানিতে ভেজার চিহ্ন ফুটে উঠছে।
.
লেখাগুলো পড়তে চোখ ধরে আসছিলো। অনেকদিন পর আমার শরতীর চিঠিখানি আবার পড়ছি। চিঠিখানির ওপর সেদিনের মত আজও ফোটা ফোটা পানিতে ভেজার চিহ্ন ফুটে উঠছে।
No comments:
Post a Comment